আফিয়া সিদ্দীকির বক্তব্য

আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রাজীম

প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা, আচ্ছালামু আলাইকুম। ধন্যবাদ সবাইকে।

শুধু এই পৃথিবীরই না, মহাবিশ্বের কোথাও যদি আরো কোন মানব সমাজ থেকে থাকে তাদের প্রতিও আমি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলছি, একমাত্র ইসলামই নারীকে দিয়েছে মুক্তি, করেছে সুরক্ষিত। আর আমি যে এমন দাবি করছি, তা বড়াই দেখানোর জন্য করছি না, করতে পারছি কারণ আমি বিশ্বাস করি ইসলাম এসেছে মহান ন্যায়বিচারক এবং পরম দয়ালু আল্লাহর তরফ থেকে। নারী এবং পুরুষ উভয়কেই যে স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন, তিনি তো আর কারো প্রতি পক্ষপাতী আচরণ করতে পারেন না। ইসলামই নারীকে এমন এক উচ্চ আসনে উন্নীত করেছে, যার কোনো তুলনা হয় না।

পশ্চিমা দার্শনিক, সেইন্টদের একটা উদাহরণ দেখাই। তারা নারীদের বলে শয়তানের বাহন। অথচ কুরআন তাদেরকে সম্বোধন করছে “মুহসিনা” (অর্থাৎ শয়তানের বিরুদ্ধে দূর্গ) বলে। তাদের দাবী নারীর কারণেই মানুষকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নেমে আসতে হয়েছে, অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন জান্নাত; জান্নাত হলো নারীর মানে মায়ের পায়ের নিচে। এখানেই শেষ নয়, জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই তাকে অধিকার আর নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। মানুষের সমস্ত মৌলিক চাহিদা তার জন্য ইসলাম নিশ্চিত করেছে। উত্তরাধিকারী হওয়ার, সম্পদের মালিকানা পাওয়ার, পছন্দসই স্বামী নির্বাচন করার, মোহরানা পাওয়ার, তালাক দেওয়ার অধিকার একজন নারীর আছে। ইসলাম একজন নারীকে শুধু উপার্জন করার স্বাধীনতাই দেয়নি, উপার্জিত প্রতিটা পয়সা সে চাইলে নিজের কাছে রাখতে পারবে, কেউ কিচ্ছু দাবি করতে পারবে না সেখান থেকে। আর কয়টার কথা বলব? যেদিকেই তাকান, সেদিকেই নারীর অধিকার ইসলামে সুনিশ্চিতভাবে বলা আছে।

আচ্ছা, এই কথাটা এখানে পরিষ্কারভাবে বলে রাখা ভালো, ইসলাম অনুসারে অর্থ উপার্জন কিন্তু নারীর কর্তব্য নয়। তার দায়িত্ব আল্লাহ এবং নিজের পরিবারের প্রতি। আর সে যদি এ কাজটাই ঠিকভাবে করতে পারে, রাসূলুল্লাহ ﷺ জানাচ্ছেন, তাহলে এটাই তার নাযাতের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তার মানে এই না, একজন নারী তার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দাসের মতো খাটবে। অন্তত নবী করীম ﷺ ও তার সাহাবীদের (রা) শিক্ষা কখনোই এমন না।

একবার এক লোক খলিফা ঊমার (রা) এর কাছে তার স্ত্রীর নামে বিচার দিতে এসেছিল। কিন্তু খলিফার দরজার কাছে এসে সে শুনতে পেল খলিফার স্ত্রী খলিফাকে তিরস্কার করছেন। অথচ ঊমার (রা) এর কণ্ঠ শোনাই যাচ্ছে না! ‘বেচারা খলিফাও দেখছি আমার মতো যন্ত্রণায় আছেন’ এই কথা ভেবে লোকটি বিচার না দিয়েই চলে যাচ্ছিল। ঊমার (রা) লোকটিকে দেখে ফেললেন এবং ডেকে তার ঘটনা জানতে চাইলেন। সব শোনার পর খলিফা লোকটিকে কী বলেছিলেন জানেন?

­­­বলেছিলেন, “আমার স্ত্রী আমার জন্য রান্নাবান্না করে, আমার কাপড় ধুয়ে দেয়, আমার বাচ্চাদেরকে দুধ পান করায়; যদিও এসব করতে সে বাধ্য না। আর এতে করে আমার কোনো বাবুর্চি, ধোপা বা নার্স নিয়োগ করা লাগছে না। তার চেয়েও বড় কথা ওকে নিয়ে আমি সুখে আছি, ওর জন্যই আমি যিনা থেকে বেঁচে আছি। এসব কারণেই আমি তাকে কখনো কখনো ছাড় দেই এবং আমার পরামর্শ থাকবে তুমিও তা-ই করবে।”

রাসূল ﷺ বলেছেন,  তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সবচেয়ে উত্তম, যে তার স্ত্রীদের কাছে উত্তম।

কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“…তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করবে; তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ কর তবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ্‌ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ।” (সূরা নিসা, ৪:১৯)

আরও বলেন,

“…তাদের ক্ষতি করে সীমালংঘনের উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটকে রেখো না। যে তা করে, সে নিজের প্রতি যুলুম করে। আর তোমরা আল্লাহ্‌র বিধানকে ঠাট্টা-বিদ্রুপের বস্তু করো না।” (সূরা বাক্বারা, ২:২৩১)

প্রিয় ভাইয়েরা, আল্লাহ এখানে দায়িত্বের কথা বুঝিয়েছেন! আর বোনেরা আমার, এর মানে এই না আমরা এসব উদাহরণ সামনে এনে পুরুষদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করতে থাকব। না! আমি যা বলতে চাইছি তা হলো, একজন নারী একজন অবৈতনিক দাসী নয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ নারীকে একটি ঘরের রাণী হিসেবে অভিহিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তার ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে, তাকে দেওয়া হয়েছে সম্মান, নিরাপত্তা আর মর্যাদা। অন্যান্য সমাজ, বিশেষত পশ্চিমারা এসব দেয়নি।

হিজাব মানে নারীকে আবদ্ধ করা নয়। এটা বরং তাকে পট্টি দিয়ে বিচার না করে তার স্বকীয়তা দিয়ে বিচার করতে শেখায়। বইকে তো বিচার করতে হয় এর ভেতরের লেখা দিয়েই, প্রচ্ছদের শিল্পগুণ দেখে না। আমরা যেমন, আমাদেরকে সেভাবেই মূল্যায়ন করতে হবে।

ইসলাম চায় না নারীরা নিজেদেরকে গরুর মতো সারা বিশ্বের সামনে দেখিয়ে বেড়াক।

রাসূল ﷺ চমৎকার একটা উপসংহার টেনেছেন। তিনি বলেছেন, একজন ধার্মিক নারীই কারো জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। কথাটা খুবই প্রজ্ঞাপূর্ণ। দেখুন, একজন ধনাঢ্য বা (দুনিয়াবি হিসেবে) একজন সফল মহিলার কথা বলা হয়নি। কারণ এসব গুণ দীর্ঘদিন যাবত কারো তেমন একটা উপকারে আসবে না।

প্রেম ফিকে হবে, সম্পদ খরচ হয়ে যাবে, সৌন্দর্য মলিন হয়ে যাবে!
এসব গুণাবলি পার্থিব জীবনের তৃপ্তির জন্য, আর ধর্মনিষ্ঠার লক্ষ্য শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি। সেকারণেই মহানবী ﷺ পুরুষদের উপদেশ দিয়েছেন পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দিতে। অর্থ-সম্পদশালী না, মার্সিডিজ গাড়ির মালিককে না। এমনকি ডানাকাটা পরীকেও না। কিংবা যে অনেক যৌতুক দিতে রাজি আছে, তাকেও না।

না! ইসলামে একজন নারী সর্বপ্রথম আল্লাহর দাসী, কোনো মানুষের না। এবং আল্লাহর কাছে সে পুরুষের চেয়ে নিচু কেউ নয়। তবে এটা সত্য,

“পুত্র সন্তান কন্যা সন্তানের মতো নয়।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩:৩৬)

নারীরা পুরুষদের থেকে আলাদা। শারীরিক, মানসিক এবং জৈবিক সব রকম ভাবেই আলাদা। ছেলেরা মেয়েদের চাইতে শক্তিশালী, এটা আমরা দেখতেই পাই। ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হবে না। একারণেই আল্লাহও পরিবারের ভরণপোষণের দায়দায়িত্ব তাদের ওপরই দিয়েছেন। তার ওপরই ন্যস্ত হয়েছে দারাজা, তথা পরিবারের নেতৃত্ব। কিন্তু এর ফলে মেয়েদেরকে খাটো করা হয় নি। না! অধিকারের প্রশ্নে নারীপুরুষ সমান, যদিও পুরুষকে নারীর ওপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবারের দেখাশোনা করার এবং চালিয়ে নেওয়ার কর্তৃত্ব, দায়দায়িত্ব এবং ঝুঁকি। এর সাথে কাউকে খাটো করা না করার সম্পর্ক কোথায়? কোনো সম্পর্ক নেই।

আল্লাহ স্পষ্ট বলে দিয়েছেন,

“নিশ্চয় আমি তোমাদের মধ্যে আমলকারী কোন নর বা নারীর আমল বিফল করি না; তোমরা একে অপরের অংশ।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৯৫)

এবং,

“তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়া সম্পন্ন।” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)

আল্লাহর কাছে সে-ই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, মর্যাদাবান যার ঈমান বেশি, যার তাকওয়া বেশি। হোক সে নারী বা পুরুষ।

ইতিহাস এমন অনেক নারীর নজিরে পরিপূর্ণ যেখানে দেখা যায় তারা নারী-পুরুষ সবাইকেই শিক্ষা দিয়েছেন, তারা ধর্মীয় বিধান অনুসারে রায় দিয়েছেন, আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করেছেন, শহীদ হয়েছেন। এতসব কিছু তারা বিশ্বকে তাঁদের সক্ষমতা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য করেননি। প্রিয় মুসলিম বোনেরা আমার, আমরা অমুসলিম মেয়েদের মতো না। এই পৃথিবীর কাছে প্রমাণ করার কিছুই নেই। আমাদের যা করতে হবে, তা হলো, আল্লাহর কাছে প্রমাণ করা। প্রমাণ করা যে, হ্যাঁ, আমরা পারি। আমরা পারি আদর্শ মুসলিম নারী হতে। সাহাবীদের (রা) মতো উঁচুমানের মুসলিমাহ। ‘পাঁচ ফিট দশ ইঞ্চি উচ্চতা’র বা এমন কোনো দিক দিয়ে উঁচু না।

সাহাবাদের শত শত উদাহরণ আমি দিয়ে যেতে পারব। কিন্তু তা শুনতে গেলে আপনারা ধৈর্য হারিয়ে ফেলবেন। তাই আমি এখন কেবল একটি উদাহরণ দেখাব। আসমা বিনতে ইয়াজিদ। হিজরতের সময়, কিশোরী বয়সে তিনি ইসলাম কবুল করেন। আর ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল বিশের কাছাকাছি। সেই যুদ্ধে তিনি হত্যা করেন ৯ জন কাফিরকে। কী দিয়ে জানেন? তাঁবুর একটা খুঁটি দিয়ে! মেয়েদের কথা বাদ দিলাম। আমি জানি না কয়জন পুরুষ এমনটা করতে পারবে আজকের যুগে বা যে কোনো যুগেই হোক। শুধু তাই না, তিনি অত্যন্ত বিদুষীও ছিলেন। তিনি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং তাবেঈদের যুগের আমাদের বহু সম্মানিত উলামা সেই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করেন। আয়েশা, খাদিজা, ফাতিমা, যয়নব, আসমা, উম্মে আম্মারা, উম্মে সালামাহ, উম্মে কুলসুম, উম্মে হাকীম… কত নাম! রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম।

তারা কারা? তারা সবাই রাসূল ﷺ এর যুগের প্রাজ্ঞী, শিক্ষিকা, ডাক্তার, নার্স, সমাজসেবিকা, যোদ্ধা এবং অবশ্যই মা, বোন ও স্ত্রী। তাঁদের মতো মানুষের সম্পর্কেই আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,

“আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তার প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহ্‌র দল। জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর দলই সফলকাম।” (সূরা আল মুজাদালাহ, ৫৮:২২)

আর সাফল্য আমাদের হাতে ধরা দিয়েছিল। আখিরাতের তো বটেই, দুনিয়ার সাফল্যও। হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর পর মাত্র ত্রিশ বছরেই ইসলাম ছড়িয়েছে আফ্রিকায়, ভারতে। পৌঁছে গেছে স্পেন পর্যন্ত। তিন তিনটি মহাদেশে! এখন আমি আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, কেন আজ আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর তালিকায়? আমাদের প্রতি যে সম্মান আর শ্রদ্ধা ছিল সবার, তা আমরা হারালাম কেন? আমরা কোনো কাজের জন্য কারো কাছে আজ কৈফিয়ত দেই? কার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করি? অবিশ্বাসীদের কাছে, কুফফারদের কাছে। আস্তাগফিরুল্লাহ, আল্লাহ আমাদের মাফ করুন।

মুহাম্মদ বিন কাসিম, তারিক বিন যিয়াদ, খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো বীর সন্তানেরা আজ কোথায়? কারণ সেরকম বীর জন্ম দেওয়ার মতো, ফাতিমা এবং যয়নবের মতো মা এই উম্মাহর নেই।

আর এমন মা আমাদের নেই কেন? আসুন এই ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখি…

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদেশপ্ৰাপ্ত হয় তা-ই করে।” (সূরা আত তাহরীম, ৬৬:৬)

হে বিশ্বাসীরা, নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচান।

আল্লাহ সীমালঙ্ঘন পছন্দ করেন না, বাড়াবাড়ি পছন্দ করেন না … কিছু লোক আছে যারা এখনও তাদের অধীনস্থ নারীদের জীবন্ত কবর দেয়! হ্যাঁ, জীবন্ত। তফাৎটা এই, তারা কবরস্থ করে মানসিকভাবে। তারা বলে মেয়েরা পুরুষের দাসী, থার্ড ক্লাস দাসী। আর আল্লাহ মাফ করুক, তারা এসব বলে সুন্নাহর দোহাই দিয়ে! সুন্নাহ? কার সুন্নাহ তারা অনুসরণ করছে?

এটা তো রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ অবশ্যই না। সুন্নাহ কী? রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের ছেঁড়া জুতা নিজে সেলাই করতেন। স্ত্রী আয়েশা (রা) এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন আর তাতে ইচ্ছে করে হেরে যেতেন। হেরে যেতেন, যেন আয়েশা (রা) মনে কষ্ট না পান।

এই চরমপন্থী ভাই বোনেরা ইসলাম থেকে অবিশ্বাস্য সংখ্যক মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। শুধু নারীদেরকেই না, পুরুষদেরকেও। শুধু কাফির-দেরকেই না, মুসলিমদেরকেও।

এক লোক একবার ইসমাঈল আল ফারুকীর কাছে আসলো। বলল, তার কাছে ইসলামকে খুবই একপেশে ধর্মের মতো লাগে। যখনই সে কোনো মসজিদ বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায়, সেখানে শুধু পুরুষদেরই দেখে। তার প্রশ্ন ছিল, “মহিলারা কোথায়?”। দারুণ প্রশ্ন। আমিও জিজ্ঞেস করতে চাই, আমাদের মেয়েরা কোথায়?

এখন যে কারো পক্ষেই কোনো মহিলাকে এসে ইসলামের নাম দিয়ে যা তা বলে বুঝ দেওয়া সম্ভব। আর এমন অবস্থায় সেই হতভাগী মহিলা কী-ই বা বলতে পারে? “হ্যা, ঠিকই বলেছেন!” আমার বিশ্বাস, সে মাথা নেড়ে এটাই বলবে। সে জানে না তো কিছু। জানবে কোত্থেকে? তার “মৌলিক অধিকার” না বলে বরং বলব তার শিক্ষিত হওয়ার দায়িত্ব, ইসলামিক এবং সেক্যুলার উভয় শিক্ষাই, তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে কী হলো? ভাইয়েরা, বোনেরা। মেয়েদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিয়ে আমরা এখন কী দেখছি?

যদি ইসলাম সম্পর্কে কোনো নারীর জ্ঞান থাকে জোড়াতালি গোছের কিংবা অমুসলিমদের ধারণা সে লালন করে অথবা তার চারপাশের দুনিয়া সম্বন্ধে তার কোনো খবরই না থাকে, তাহলে সে কি পারবে তার সন্তানকে নিখুঁত মুসলিমের আদলে গড়ে তুলতে?

কক্ষনো না! একজন শিশুর জীবনের প্রথম পাঁচটা বছর ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী মানুষের ব্রেন শুধু মাতৃগর্ভেই গড়ে ওঠে না। এর পরিপূর্ণতা পেতে পাঁচ বছর লেগে যায়। আর এই পাঁচ বছরে শিশু তার চারপাশে যা কিছু দেখবে, শুনবে; তার বাবা-মা’কে যা কিছু করতে দেখবে সেসবের প্রভাব পড়বে তার ভবিষ্যৎ আচার আচরণের ওপর। যদি কোনো মা নিজে একজন আদর্শ মুসলিমাহ হন, বাবা হন আদর্শ মুসলিম পুরুষ, তখন বাচ্চাটাও আদর্শ মুসলিম না হয়ে যাবে কোথায়?

কিন্তু একজন মা যদি নিজেকে অন্ধকার ঘরের অন্ধকার কোণে আটকে রাখেন, সবসময় থাকেন বাইরের পৃথিবী থেকে নিভৃতে তাহলে তার কাছ থেকে কীই বা আর আশা করা যায়? প্রজন্মের এই ফাটল কোত্থেকে এলো? আর কেন মুসলিম বিশ্বে এত এত অনৈসলামিক রীতিনীতি ছড়িয়ে পড়ছে? এমন অনেকগুলো রীতির একটি হলো, যৌতুক প্রথা। যৌতুক, একটু আগে নাটিকাতে আপনারা যেমনটা দেখলেন, ভারত-পাকিস্তানে এই জিনিসটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের সময় মেয়েকে নিজের সাথে করে প্রচুর টাকাপয়সা, ফার্নিচার সহ আরও আরও অনেক কিছু শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়, এটাই যৌতুক। এটা সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী একটা চর্চা। আর এই যৌতুক দিতে পারবে না বলেই কত ভালো ভালো মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না।

আবার যাদের বিয়ে হচ্ছে, অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা সেই বিয়েতে রাজি ছিল কিনা সেটাই জানতে চাওয়া হয়নি। অথচ আল্লাহ বলেছেন,
“হে ঈমানদারগণ! জবরদস্তি করে নারীদের উত্তরাধিকার হওয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয়।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১৯)

আর যদি মেয়েগুলোর বিয়ে হয়, আল্লাহ মাফ করুক, যদি মেয়েগুলোর বিয়ে হয় কোনো পাষণ্ড লোকের সাথে, তাহলে সেই লোকের অত্যাচার সে সহ্য করে যায় আজীবন। কারণ মেয়েরা জানেই না বিয়ের সময় কাবিননামায় পাত্রীর তালাক দেওয়ার অধিকার থাকবে, এমন চুক্তিও লিখে দেওয়া যায়। আমি ভুল বলে থাকলে জামাল বাদাউয়ি ভাই শুধরে দেবেন প্লিজ। (দর্শক সারিতে বসা ড. জামাল বাদাউয়ি আফিয়া সিদ্দিকীর কথায় সম্মতি জানালেন) হ্যাঁ, আপনি বললেন আমি ঠিক বলেছি। (ড. বাদাউয়ি এসময় বললেন, আরও ব্যাপার আছে।) হ্যাঁ, আরও আছে! অবশ্য সমস্যা হলো এতকিছু নিয়ে বলার সময় পাব না। যাই হোক, এটি অন্তত একটি।

কিছু গোঁড়া পরিবার আছে, যদি কোনো মেয়ে বলতে চায় তার বিয়ের শর্তে কী কী থাকবে, পরিবারগুলো তখন মেয়েটার অবস্থা নাজেহাল করে ছাড়ে। মেয়েটার গায়ে “নির্লজ্জ” তকমা লাগিয়ে দেয়। এছাড়া কোনো মেয়ের তালাক হলে কেন সমাজ তাকে খারাপ চোখে দেখে? যেখানে ইসলাম এমনটা করে না, আল্লাহ তা’আলা করেন না!! কুরআনে আল্লাহ কার্যত রাসূল ﷺ এর স্ত্রীদেরকে (যখন তারা মুহাম্মদ ﷺ কে মুখের কথায় কষ্ট দিচ্ছিলেন) সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি তোমরা অনুতপ্ত না হও, তাহলে আমি তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করব এমন নারীদের, যারা তোমাদের চাইতে উত্তম হবে। যাদের আগে বিয়ে হয়েছিল। যারা এখনও কুমারী আছে।

সম্মানিত উপস্থিতি, পাকিস্তানে থাকা অবস্থায় আমি ইউনাইটেড ইসলামিক অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্টের সাথে দু’বছর কাজ করেছি। তিনি আগামী সপ্তাহে আসবেন আমেরিকায়। আপনারা তাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। তিনিই আপনাদের জানাবেন প্রতিদিন কতশত মহিলা এসব অনৈসলামিক আচার ব্যবস্থার বলি হয়ে অভিযোগ করতে আসে। আর যখন আমি “অনৈসলামিক আচার ব্যবস্থা” কথাটা বলছি, বুঝে নেবেন, আমি এখানে পশ্চিমা সমাজের ডেটিংয়ের রীতিসহ আরও যা কিছু আছে সবগুলোকেই যুক্ত করছি। সবকিছুকেই।

প্রিয় ভাই-বোনেরা, একে এখনই বন্ধ করতে হবে। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে। মুসলিম হিসেবে আমাদের লক্ষ্য কী? আমাদের লক্ষ্য আল্লাহর ইবাদাত করা। এসব অনৈসলামিক কার্যকলাপ এখন এত বেশি কেন? এই অবস্থা শীঘ্রই বদলাতে হবে।

“যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার জন্য বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি?” (সূরা হাদীদ, ৫৭:১৬)

হ্যাঁ, সেই সময় এসেছে। এবং তা এখনই। সময় হয়েছে আমাদের একত্র হওয়ার এবং এই সমস্যগুলোর সমাধানে কাজ করার। আমরা কেউ যেন মনে না করি –‘পারব না’। পারব। আমরা পরিবর্তন আনতে পারব, যদি আমাদের নিয়ত শুদ্ধ থাকে। এটা আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম। আল্লাহ বলেছেন,

“যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহে পরিচালিত করব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গেই থাকেন।” (সূরা আনকাবূত, ২৯:৬৯)

আল্লাহই আমাদের জন্য পথ সহজ করে দেবেন। আল্লাহ তো তাদের সাথেই আছেন, যারা ন্যায়পরায়ণ, সৎকর্মশীল, যারা ‘মুহসিনীন’।

তাই আসুন, আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক যা কিছুই ইসলামের বিপক্ষে যায় সেগুলোকে পরিহার করি। শুরু করি ইসলামের পথে হাঁটা। ওয়ামা ‘আলাইনা ইল্লাল বালাগ, আল্লাহর বাণী প্রচার করাই আমাদের দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WordPress Lightbox Plugin