কয়েদী ৩৪৫ থেকেঃ একটি হৃদয়বিদারক চিঠি

এবার চল্লিশ বছরের এক আলজেরিয়ার বংশোদ্ভুত বসনিয়ান নাগরিকের গল্প বলবো। মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। তাকে আমরা বসনিয়ার আলহাজ্জ বলে ডাকতাম। কয়েদখানায় সে আমার প্রতিবেশি। প্রাজ্ঞ, শান্ত ও কোমল স্বভাবের মানুষ। তার চোখে এক গভীর দুঃখের ছাপ। কিন্তু সে থাকতো চুপচাপ, দূরত্ব বজায় রেখে। তার কষ্টের কথা কিছুই ভাগাভাগি করতো না। কাউকে বলতো না। তার ব্যাপারে জানতে পারি তার কাছে আসা একটি চিঠি থেকে। চিঠিটি পাঠিয়েছে তার স্ত্রী।

“আমার অনুপস্থিত স্বামী আবু শায়মার প্রতি, আল্লাহ তাকে সমস্ত খারাবি থেকে বাঁচিয়ে রাখুন।

আল্লাহর রহম ও ফজল আপনার প্রতি।

লেখার পূর্বেই একটি বিষয়ে সংকোচ করছি। আমি আগুনে কেরোসিন ঢালতে চাই না। কিম্বা চাইনা আপনার বয়ে চলা যন্ত্রনার উপর আরো যন্ত্রণা চাপাতে। কিন্তু কিছু কথা আপনাকে খোলাখুলিভাবে বলতে চাই। যদিও সেটা কঠিন ও নিষ্ঠুর। আমাদেরকে বাস্তবতা স্বীকার করতেই হবে তা যত তিক্তই হোক।

আমার অনুপস্থিত স্বামী,
কলম হাতে নিয়েছি আপনাকে লিখব বলে। শব্দেরা এলোমেলো। সন্ত্রস্ত আমি কিভাবে যে বলি! তবুও লিখছি। আপনাকেই লিখছি। চোখে অশ্রুর বন্যা। প্লাবন নেমেছে। একটু যদি হালকা হই। এই আশায় লিখছি।

আমার ফুল, শায়মা… আমাদের সাত বছরের কন্যাকে ডেকে তুলি। সকালে। নাস্তা খাবে তাই। বালিকা মেয়ে আমার বলে: “মা, সন্তানদের সামনে বাবা-মার মরে যাওয়া অনেক স্বাভাবিক ঘটনা, তাই না?

“হ্যাঁ, আমি বললাম, কিন্তু তুমি এসব জিজ্ঞেস করছো কেন?”

“আমার মনে হয় আমি মরে যাব। তোমার সামনেই,” সে বললো।

আমি তার মুখ চেপে ধরি। যাতে সে আর কথা বাড়াতে না পারে।

“নাস্তা প্রস্তুত, ছোট্ট মামনি আমার। এখানে আসো। স্কুলে যেতে দেরি করোনা যেন।”

একটু আড়ালে চলে যাই যাতে সে আমার চোখের অশ্রু দেখতে না পারে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে এনে আবার সামনে চলে আসি। এসে দেখি সে বিছানায় শুয়ে আছে। বললাম: “কেন তুমি এতো আলসেমি করছো আমার লক্ষীসোনা?”

ক্ষীণকণ্ঠে সে বললো: “আমার খুব ক্লান্ত লাগছে মা! আজ স্কুলে যাব না।”

তার চোখের দিকে তাকালাম। দেখলাম সে সত্য বলছে। হাসপাতালে ফোন করলাম। সময়ের ব্যবধান খুব বেশি হবে না। স্কুল বাসের পরিবর্তে সে উঠলো অ্যাম্বুলেন্সে। সাইরেন বাজছে অ্যাম্বুলেন্সের। সকালের ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। হাসপাতালের দিকে। অবশেষে সারাজেভোর বিশেষায়িত হাসপাতালে এসে পড়ি শায়মাকে নিয়ে। আলহামদুলিল্লাহ। শায়মার একজন কার্ডিওলজি ডাক্তার সেসময় হাসপাতালে ছিলেন। তৎক্ষনাৎ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে শায়মাকে আইসিইউতে বদলি করা হলো।

আমাদের প্রিয় সন্তানটি তখন সম্পূর্ণ কোমায়। জানালার বাইরে থেকে তাকে দেখলাম পুরো দুটি রাত। জানতে চাইবেন না সে রাত কত দীর্ঘ ছিল।

তৃতীয় দিন। সকালে সূর্য ওঠে। খুকু মনির দেহে তখনো প্রাণ ছিল। রাত নামে। চাঁদটা চলে যায় বাসা থেকে। শায়মার আত্মাটা নিয়ে যায় ফেরেশতারা। দেহটা পড়ে থাকে।

এরপর কি হচ্ছে খেয়াল নেই। শুধু এতটুকু মনে আছে-সারাজেভো গোরস্থানে অনেক মানুষের সমাগম। কাউকে চিনি, কাউকে চিনি না। শায়মার স্কুলের সহপাঠীরা তার লাশ নিয়ে কবরে যায়। অশ্রুভেজা নয়নে তারা তাকে শেষ বিদায় জানায়।

আমি বাসায় ফিরে আসি কিন্তু ঘরে ঢুকতে পারছিলাম না। দৈত্যের মতো লাগছিল আমাকে। বাড়ির চৌকাঠেই বসে পড়ি। যে ঘরে খুকুমনি থাকতো সে ঘরে আমি কিভাবে প্রবেশ করি ওকে ছাড়া! এটা আপনি চলে যাওয়ার চার বছরের কষ্টের চেয়েও বেশি। আমাদের বেডরুমে আমি ঘুমাতে পারি না। শায়মার রুমে গিয়ে শুই। কিন্তু ঘরের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে গিয়ে আমি একটু ঘুমাতে পারি!

আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার বাবার বাড়িতে। যতদিন না আপনি আসছেন। আমরা আপনার জন্য হৃদয়ে দীপশিখা জ্বালিয়ে রাখি। শীঘ্রই এসে আপনি ঘরে আলো জ্বালবেন বলে। উপরওয়ালার ইচ্ছায়। যিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।

আপনার স্ত্রী
উম্মে শায়মা।

Leave a Reply

WordPress Lightbox Plugin