আসলে আফিয়ার অপরাধটা কী ছিল?

ড. ফাওজিয়া সিদ্দিকী: আপনাদের কাছে সবকিছু পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার জন্য আমি আফিয়ার ছোটবেলা দিয়েই শুরু করতে চাই। আসলে ওর জীবনের পুরো আটত্রিশ বছর, আর আট বছরের কারাজীবনকে একসাথে সংক্ষেপে বলাটা কিছুটা অসম্ভব আমার জন্য। তবুও যতটুকু পারি চেষ্টা করব। আফিয়া কে ছিল, তার লক্ষ্য কী ছিল তা বলব। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী এবং মামলার অগ্রগতি কতটুকু তাও জানাবো।

আমাদের বাবা ছিলেন একজন চিকিৎসক আর মা সমাজকর্মী। আমরা তিন ভাইবোন। বড় ভাইয়া আমেরিকায় থাকেন, তারপর আমি। আমি একজন নিউরোলজিস্ট, পড়াশোনা করেছি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সবশেষে আমাদের সবার ছোট আফিয়া। আপনারা জানেন পরিবারের ছোটজন সবার ভীষণ আদরের হয়। আফিয়াও ছিল তেমনি আমাদের চোখের মনি। শুধু ছোট হওয়ার জন্যই তাকে সবাই খুব পছন্দ করতাম এমনটা নয়। আল্লাহ ওকে অসাধারণ মেধাবী করে পাঠিয়েছেন। ক্লাসে সবসময় সে ফার্স্ট তো হতোই, অসংখ্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সেগুলো থেকেও প্রচুর পুরস্কার জিতে নেয়। কোনো প্রতিযোগিতার নাম আপনি বলবেন? সবগুলোতেই সে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। কোনো বিতর্ক বা রচনা প্রতিযোগিতায় সে কখনো পরাজিত হয়নি। তাই অনেক ট্রফি আর সার্টিফিকেট পেয়েছে। আমরা এখনো সেগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছি।

ইন্টারমিডিয়েটে আফিয়া ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হলো। তখনই আমেরিকায় ফুল স্কলারশিপে পড়ার একটি অফার পেল সে। ভাইয়া যেহেতু আগে থেকেই ওখানে আছে, তাই বাসা থেকেও সবাই রাজী হয়ে গেল ওকে ওখানে পাঠানোর ব্যাপারে। তো যাওয়ার আগে একটি টেস্ট পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। সেটায় সে একেবারে বিশ্বের এক নাম্বার বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসেচুসেটস ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (MIT)-তে টিকে গেল। তারপর ওখানেই ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করল।

ছোটবেলা থেকেই তার খুব পছন্দের কিছু জিনিস ছিল। আফিয়া একবারে যখন ছোট, পুতুলের জন্য ছিল ব্যাপক টান। একটু বড় হওয়ার পর থেকে সেই আকর্ষণ সরে এল ছোট ছোট বাচ্চাদের প্রতি। এ ছাড়া বয়স্কা মহিলাদের জন্যও ওর হৃদয়ে বড় একটা জায়গা ছিল। তাই আমেরিকা যাওয়ার পরও সেখানকার বৃদ্ধাদের সেবা করার পেছনে অনেক সময় দিয়েছে। আর কুরআনের জন্য ভালোবাসা ছিল সবকিছুর ওপরে। এমআইটিতে পড়ার সময়ই আফিয়া কুরআন হিফজ করে। বিশেষ করে বলতে চাই সে কিন্তু শুধু কুরআনই মুখস্থ করেনি বরং অর্থ এবং তাফসীরসহ কুরআন শিখে ফেলেছিল। কখনো কেউ কুরআনের কোনো ঘটনা বা হুকুম ওকে জিজ্ঞেস করলে আফিয়া সেই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করত। তারপর এদের অর্থ বলে ব্যাখ্যা শোনাতো। নিজের ক্লাসের সেরা ছাত্র যেমন ছিল, আমার বোন একই সময়ে কুরআন শেখাও চালিয়ে গেছে।

ওখানে আফিয়া কুরআনের কপি এবং এর অনুবাদ বিতরণ করত। বিভিন্ন সংগঠন যেভাবে তাদের মুদ্রিত রচনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে টেবিলে করে প্রদর্শন করে, আফিয়া ঠিক ওভাবে করে কুরআন নিয়ে বসত। ওর টেবিলে লেখা থাকত আপনার জীবনের ফ্রী এনসাইক্লোপিডিয়া (মুক্ত বিশ্বকোষ)। ওর সব টাকা কুরআনের এসব কপি কেনার পেছনে ব্যয় করত। সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অনেকেই জিজ্ঞেস করত এই বই সম্পর্কে। তাদেরকে আফিয়ার সহজ জবাব ছিল, এটা আপনার জীবনের সব জ্ঞানের আধার।

মাঝেমধ্যে আমি ওকে বলেছি কুরআনের পাশাপাশি কিছু সাহিত্যের বইও রাখতে। কিন্তু ও তখন বলেছে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দাওয়াতের পদ্ধতি এমন ছিল না। তিনি (ﷺ) লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিতেন না। তিনি কুরআনের আয়াত থেকে তিলাওয়াত করতেন। তার যুক্তি থাকত কুরআন থেকেই। তার দাওয়াত আবর্তিত হতো কুরআনের বক্তব্যকে ঘিরেই। আফিয়া প্রায়ই সেসব লোকদের জন্য আফসোস করত যাদের প্রচুর জ্ঞান আর মেধা থাকা সত্ত্বেও তারা সহজ একটা ব্যাপার বোঝে না। সে আমাকে তার ক্লাসের এক বান্ধবীর সম্পর্কে বলেছে যে দুশ্চিন্তা কমাতে গান শুনত। আর চাপ খুব বেড়ে গেলে সে যেত ডিস্কো বার-এ। যার প্রধান দরজায় লেখা ছিল, “নরকের প্রবেশমুখ”! আফিয়া বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিল, তারা নিজেরাই তাদের দরজায় লিখে রেখেছে নরকের প্রবেশমুখ, তবুও লোকে তার ভেতর যাচ্ছে কী করে! ওর বন্ধুরা ওকে জিজ্ঞেস করত কিভাবে সে মিউজিক, বার, ওয়াইন ছাড়া এত এত চাপ সামলায়। আফিয়া বলত সে কুরআন তিলাওয়াত শুনেই ওসব চাপ মোকাবেলা করতে পারত।

যেমনটা বলছিলাম, বৃদ্ধদের প্রতি আফিয়ার আলাদা একটা টান ছিল। আমেরিকায় গিয়েও আফিয়া প্রায়ই বৃদ্ধাশ্রমে যেত। বয়স্কা মহিলাদের দেখাশোনা করত, গোসল করিয়ে দিত, চুল আঁচড়ে দিত। কখনো কখনো মানসিক রোগীদেরও সেবা করতে যেত স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে। আমি কয়েক বার জিজ্ঞেস করেছিলাম এসব প্রতিবন্ধী শিশুর সেবা করে কেন সে, যারা কিনা বিনিময়ে একটা ধন্যবাদও দিতে পারবে না। এদিকে আশ্রমের বৃদ্ধরা অনেকেই তো আরও অকৃতজ্ঞ। পারলে অভিশাপ দেবে বরং। আফিয়া বলেছিল কৃতজ্ঞ লোকের জন্য তো সেবা করার মানুষের অভাব নেই। এই দুর্ভাগা মানুষগুলো কারো যে-কোনো সুনজর থেকে বঞ্চিত। এজন্য আমি তাদের সেবাই করি। যেগুলোর কথা বললাম এগুলো তার শখের কিছু নমুনা ছিল। কিন্তু তার অন্য এক স্বপ্নের স্থান ছিল সবকিছুর ওপরে। আর সেই স্বপ্ন ছুঁতেই সে খেটেছে সবচেয়ে বেশি।

আফিয়া ব্র্যান্ডিজ থেকে পিএইচ.ডি. সম্পন্ন করে। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘অনুকরণের মাধ্যমে শেখা’। লোকে যে বলে সে নিউরোসার্জন বা পরমাণু বিজ্ঞানী ছিল এগুলো সব ভুয়া কথা। তার পারদর্শিতা ছিল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। বিশ্বাস করত দেশের ভাগ্যই বদলে দেওয়া সম্ভব যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যায়। সে এমন এক পাঠ্যক্রম তৈরি করছিল যা বাচ্চাদের জন্য সহজবোধ্য এবং একইসাথে আনন্দদায়ক হবে। এজন্য সে দশ বছরের একটি সিলেবাস তৈরি করে আমাকে দেখিয়েছিল। আমি চমকে উঠেছিলাম সেখানে ইসলামিক স্টাডিজ নামে কোনো বিষয় না দেখে। কারণ জানতে চাইলে আফিয়া পরিষ্কার কণ্ঠে আমাকে জানায় যে, ইসলাম হলো পূর্ণাঙ্গ জীবন এবং সমস্ত বিষয়ের মূল উপাদান।

এরপর যখন আমি সেই সিলেবাসটি বিস্তারিতভাবে দেখতে লাগলাম, বুঝতে পারলাম সে প্রতিটা বিষয়ই ইসলাম এবং কুরআনের সমন্বয়ে সাজিয়েছে। সে বিশ্বাস করত আধুনিক গবেষণা আর আবিষ্কার প্রকৃতার্থে নতুন নয়। বরং এগুলো সব ইসলামের মূলনীতিতে প্রোথিত জ্ঞান থেকেই আহৃত। এখন আমার মনে হয়, যদি আমাদের হর্তাকর্তারা তার শিক্ষানীতির গুরুত্ব বুঝত, আমাদের সার্বিক অবস্থা অনেকখানি উন্নত হতে পারত। আমাদের যুবসমাজকে তাহলে আজ আর বিদেশের ভিসার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হতো না। বিশ্বাস করুন, আফিয়ার শিক্ষাপদ্ধতি চালু হলে পনের বছরের মধ্যেই দেখা যেত বিদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশে আসতে শুরু করেছে। আমাদের প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট হতো কুরআনের হাফিজ। ইসলামের ভাবগাম্ভীর্যের সাথে, কুরআন বুঝতে পারার সাথে তাদের পরিচিতি থাকত খুব বেশি। কী চমৎকার ব্যাপারই না হতো সেটা!

আমি এখন জানি কোনো জিনিসটা আমেরিকাকে এত ভয় পাইয়ে দিয়েছে। কেন আফিয়াকে এ দুঃসহ পরিণতি সয়ে যেতে হচ্ছে। বিচারকরা সবকিছু জানার পরও তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ছিয়াশি বছরের সাজা দিয়েছে। বিচারক বলেছে তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণাদি নেই তবুও এমন রায় তারা লিখেছে পাকিস্তানের আইনজীবীদের রায়ের আলোকে।

আমাদের প্রতিনিধিরা সেখানে গিয়ে জানতে পারলেন আফিয়াকে… আফিয়াকে… ওহ কিভাবে বলব আমি, আফিয়াকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে পাঁচ পাঁচজন পুরুষ আমার ছোট বোনটার দেহে তল্লাশি চালিয়েছে। তারপর ওরা কুরআন শরীফের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলেছে। আর আফিয়াকে বলেছে এর ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে। কিভাবে ও পারবে কুরআনের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে! হ্যাঁ! কী করে সম্ভব? ওরা আফিয়াকে এভাবে হাঁটার জন্য বাধ্য করত। কাপড় পরতে দিত না। নগ্ন করে রাখত। যতক্ষণ না হাঁটবে কুরআনের পৃষ্ঠার ওপর দিয়ে, ততক্ষণ কাপড় দিবে না। আফিয়া আমাদের ভাইয়ার সাথে দেখা করতে চাইলেও ওরা এই কাজ করত। আইনজীবীর সাথে কথা বলতে চাইলেও একই ঘটনা। ওরা এসব করে করে রিপোর্ট করত আফিয়া ওদের কাজে সহযোগিতা করছে না!

ছিয়াশি বছরের কারাদণ্ড পাওয়া আফিয়ার সাথে এই ছিল তাদের ব্যবহার। তার নিজের ভাই কোর্টে উপস্থিত ছিল, কিন্তু দেখা করার অনুমতি পায়নি। তারা ওর মাথা থেকে স্কার্ফ টান দিয়ে খুলে ফেলে। এরপর একে টুকরো টুকরো করে ছেঁড়ে। তারা ওর কাছ থেকে কুরআন ছিনিয়ে নেয়। সেই কুরআন যা ওকে সান্ত্বনা দিত, সাহস যোগাত। আফিয়া আদালতকে জানিয়েছে ওর কোল থেকে নবজাতক সন্তানকে ছিনিয়ে নেওয়াকেই তার কাছে মৃত্যুসম মনে হয়েছিল। কিন্তু কুরআন কেড়ে নেওয়ার তুলনায় সন্তান হারানোর সেই অনুভূতি তার কাছে কিছুই না।

ড. ফাওজিয়া সিদ্দিকী

চিকিৎসক, স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ। আমেরিকান বোর্ড অব নিউরোলজি এবং সাইকিয়াট্রি থেকে ডিপ্লোমা করেছেন। আর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন হার্ভার্ডে। আমেরিকায় সবশেষে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনাই হসপিটালে নিউরোফিজিওলজি এন্ড এপিলেপ্সি বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমেরিকার “আউটস্ট্যান্ডিং প্রফেশনাল এওয়ার্ড”-ও অর্জন করেছিলেন। পাকিস্তানের একমাত্র বোর্ড সনদপ্রাপ্ত এপিলেপ্সি বিশেষজ্ঞ। “আফিয়া মুভমেন্ট” এর পরিচালক ও আফিয়া সিদ্দীকির বোন হিসাবেই সারাবিশ্বে পরিচিত।

ফেসবুক, টুইটার @FowziaSiddiqui

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WordPress Lightbox Plugin