ফ্রি রাইটিং শিখুন

লেখালেখির জন্য যে কয়টি সৃজনশীল অনুশীলন রয়েছে, ফ্রি-রাইটিং তার মধ্যে অন্যতম। একে চেতনার প্রবাহও বলা হয়। সাদা পৃষ্ঠার জমিনে কোনোরূপ বাধা-বিঘ্নতা ছাড়া ভাবনার বহিঃপ্রকাশ করার জন্য ফ্রি-রাইটিং সবচেয়ে কার্যকরী। এর মাধ্যমে কোনোরূপ অভ্যন্তরীণ সম্পাদনা না করে অবচেতন হৃদয়কে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়। এতে আপনার ভাবনা নতুন কিছু শেখার অনুপ্রেরণা পাবে।

দৈনন্দিন লেখালেখির অনুশীলন হিসেবে ফ্রি-রাইটিং অনেক উপকারী। দিনের ব্যস্ততায় মস্তিষ্ক কলুষিত হওয়ার আগেই সকাল বেলা বিশ মিনিট ফ্রি-রাইটিংয়ের মাধ্যমে রাতে দেখা স্বপ্নকে নিপুণভাবে লিখে রাখা যায়। আবার দিনের বিশৃঙ্খলা দূর করে সেদিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো লিখে রাখার জন্য রাতের বেলাও ফ্রি-রাইটিং করা যায়।

নিয়মতান্ত্রিক ফ্রি-রাইটিংয়ের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। এক্ষেত্রে লেখার সময় আপনি নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখেন। নিয়মতান্ত্রিক ফ্রি-রাইটিং অনেক প্রকারের হয়, এ সম্পর্কে একটু পরই আলোকপাত করা হবে।

যেকোনো ধরনের ফ্রি-রাইটিংয়ের ক্ষেত্রেই আপনি দ্রুত লিখে থাকেন আর এতে আপনার চিন্তাশক্তি দ্রুত প্রবাহিত হয়। ফ্রি-রাইটিংয়ের সময় মন যা চাইবে, তা-ই লিখবেন। লেখার সময় যা হাস্যকর ঠেকে, পরবর্তীতে পড়ার সময় তা অর্থবহও হয়ে উঠতে পারে।

অনুশীলন
নিয়ম একদম সহজ। প্রথমে আপনাকে একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। আপনি কমপক্ষে কতটুকু লিখবেন, তা-ই হচ্ছে আপনার লক্ষ্য। এই লক্ষ্য নির্ধারণ করাটা সময়, শব্দ কিংবা পৃষ্ঠার বিবেচনায় হতে পারে। তারপর লেখা শুরু করুন। আপনি লক্ষ্য অনুযায়ী লিখুন, তবে চাইলে এর থেকে বেশিও লিখতে পারেন।

মনে করুন, আপনি দশ মিনিটের লক্ষ্য স্থির করলেন। এখন চাইলে আপনি এর থেকে বেশি সময় নিয়েও লিখতে পারেন।

প্রথমদিকে যখন আপনি ফ্রি-রাইটিং শুরু করবেন, তখন লিখতে গিয়ে হঠাৎই মনে হবে আপনি সব ভুলে গেছেন। কিছুই লিখতে পারছেন না। এমন হলে কখনোই লেখা থামিয়ে দেবেন না। কলম চলতে থাকবে আপন গতিতে। যদি কিছুই লিখতে না পারেন, তাহলে বারবার পারছি না, পারছি না লিখতে থাকুন। তারপর লেখার মতো কিছু পেয়ে গেলে লিখে ফেলুন। তবু কিছুতেই লেখা থামাবেন না।

উপদেশ: আপনার লক্ষ্য কতটুকু হওয়া উচিৎ?

যদি আপনার কাছে স্টপওয়াচ থাকে, তবে বিশ মিনিটের লক্ষ্য নির্ধারণ করে লেখা শুরু করুন। একবার বসে ফ্রি-রাইটিংয়ের জন্য সবচেয়ে ভালো লক্ষ্য হচ্ছে বিশ মিনিট। কিংবা স্থির করুন, এক বসাতে আপনি দুই পৃষ্ঠা লিখবেন। ইলেকট্রনিক ডিভাইসে লিখতে চাইলে ৫০০ শব্দ আপনার লক্ষ্য হতে পারে। ফ্রি-রাইটিংয়ের জন্য কত সময় ব্যয় করা আপনার জন্য কার্যকরী, তা আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে। কোনো কোনো লেখক মনে করেন, ত্রিশ মিনিটের বেশি ফ্রি-রাইটিং লেখাকে বিকৃত করে ফেলে। আবার অনেকে মনে করেন, দশ মিনিট লেখার পর ভালো লেখা আসে।

তাছাড়া, লেখার সকল মাধ্যম ব্যবহার করে দেখতে হবে। অনেক লেখক মনে করেন, হাতে লিখলে লেখায় অধিক সৃজনশীলতা আসে। যদি আপনি সচরাচর কম্পিউটারে লিখে অভ্যস্ত হন, তবে মাঝেমধ্যে খাতা-কলমেও ফ্রি-রাইটিং করা উচিৎ।

আর একবার লিখেই ফ্রি-রাইটিং বাদ দেওয়া যাবে না। যারা নতুনভাবে ফ্রি-রাইটিং শুরু করেন, তাদের অনেকেই কয়েকবার লেখার পর ফ্রি-রাইটিং বাদ দিয়ে দেন, যা কখনোই উচিৎ নয়।

প্রকারভেদ: লেখনীতে সৃজনশীলতা লাভ করার জন্য যেসব নিয়মতান্ত্রিক ফ্রি-রাইটিং করা যায়, তা হচ্ছে—

কেন্দ্রীভূত ফ্রি-রাইটিং: এর অর্থ হচ্ছে নির্দিষ্ট কোনো কল্পনা বা ধারণা নিয়ে লেখা। মনে করুন, আপনি একটা উপন্যাস লিখছেন। চরিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে বারবার। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত ফ্রি-রাইটিংয়ের মাধ্যমে উপন্যাসের চরিত্র নিয়ে কিছুক্ষণ লিখলে উপন্যাসের জট খুলে যাবে আর আপনি আবার লেখা শুরু করতে পারবেন। এটা মগজ ধোলাইয়ের মতো, এতে উপন্যাসের জন্য লেখার আগেই নিজের ভাবনাকে প্রস্তুত করা যায়।

বিষয়ভিত্তিক ফ্রি-রাইটিং: এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে লেখা হয়। আপনি যদি কোনো প্রবন্ধ লিখতে থাকেন, তাহলে সেই বিষয়ে ফ্রি-রাইটিং করা উচিৎ। এতে আপনার মস্তিষ্ক সেই বিষয় নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবে আর আপনি ধারণা পাবেন যে, আপনার প্রবন্ধে কোন লেখাগুলো অধিক কার্যকরী।

শব্দ ও চিত্রভিত্তিক ফ্রি-রাইটিং: ফ্রি-রাইটিং করতে গিয়ে আপনাকে যদি বারবার পারছি না, পারছি না লিখতে হয়, তবে এই ফ্রি-রাইটিং আপনার জন্য উপকারী। যারা কবিতা লিখেন, তারা এভাবে ফ্রি-রাইটিং করে থাকেন। যেকোনো একটা শব্দ বা ছবি কল্পনায় রেখে লিখতে হবে। লেখা থেমে গেলে (পারছি না, পারছি না লেখার পরিবর্তে) বারবার সেই শব্দটাই লিখতে থাকুন। যেমন: প্রেম, যুদ্ধ, বিচ্ছেদ, ভয় ইত্যাদি।

চরিত্রভিত্তিক ফ্রি-রাইটিং: চরিত্র সৃষ্টির সময় এই ফ্রি-রাইটিং আপনাকে সাহায্য করবে। এই চরিত্রভিত্তিক ফ্রি-রাইটিং দুইভাবে করা যায়। প্রথমত, চরিত্র নিয়ে ফ্রি-রাইটিং করা। পৃষ্ঠায় বড় করে চরিত্রের নাম লিখে টাইমার সেট করে চরিত্র নিয়ে কল্পনায় যা আসে, তা-ই লিখুন। দ্বিতীয়ত, প্রথম পুরুষ ব্যবহার করে চরিত্রের কথা লিখুন, যেন আপনি নিজেই সে চরিত্র। এতে চরিত্রের সাথে আপনি পরিচিত হয়ে উঠতে পারবেন।

সমাধানভিত্তিক ফ্রি-রাইটিং: লেখালেখিতে যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য এই ফ্রি-রাইটিং করা হয়। সমস্যার কথা পৃষ্ঠার উপর লিখে ফ্রি-রাইটিং করতে হবে। সমস্যাকে প্রশ্নের রূপ দিয়ে তার উত্তর লেখার চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে নিজের আবেগকে জাগিয়ে তুলতে হবে। এভাবে নিজেকেই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। যেমন—
‘আমার গল্পে কীভাবে রহস্য ফুটিয়ে তুলতে হবে?’
‘কবিতায় কোন বিষয়টা লিখতে ভুলে গেছি?’
‘কীভাবে প্রবন্ধটাতে নিজের ভাবনা সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারব?’
প্রশ্ন লিখে উত্তর নিয়ে ভাবনা শুরু করুন, আপনি সমাধানের দেখা পেয়ে যাবেন।

উপযোগিতা: কবিতা লেখার প্রাথমিক সরঞ্জাম জোগাড়ের জন্য ফ্রি-রাইটিংয়ের বিকল্প নেই। ফ্রি-রাইটিংয়ের মাধ্যমে চেতনার প্রবাহ ঘটিয়ে কবিতার ধারণা পাওয়া যায়। কারণ, ফ্রি-রাইটিংয়ের মাধ্যমে আপনার কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পাবে।

দৈনিক লেখালেখির অনুশীলনের জন্যও এটি জরুরি। বিশেষ করে যখন আপনি বড় উপন্যাস নিয়ে কাজ করবেন, তখন ফ্রি-রাইটিং আপনাকে লেখালেখির একঘেয়েমি কাটিয়ে উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ অবধি সৃজনশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

WordPress Lightbox Plugin